শিক্ষাগত বা দৃষ্টিশক্তি সীমাবদ্ধতায় অনেকে প্রতিদিনের কাজে, বিশেষ করে পড়াশোনায়, সমস্যায় পড়েন। প্রযুক্তির কল্যাণে এখন তারা নানা অ্যাপ ও প্রোগ্রাম ব্যবহার করে পড়তে পারেন। টেক্সট-টু-স্পিচ প্রযুক্তি দিয়ে প্রায় যেকোনো লেখা কথায় রূপান্তর সম্ভব, তাই শেখার পথে পড়া আর বাধা নয়। এতে পড়া ও শোনার দক্ষতা, সাবলীলতা এবং শব্দভাণ্ডার বাড়ে। উপরন্তু, এটি খুবই সুবিধাজনক, যেকোনো জায়গা থেকে ব্যবহার করা যায় এবং অ্যাক্সেসিবিলিটিও বাড়ায়। Apple-এর VoiceOver টেক্সট-টু-স্পিচ প্রযুক্তির চমৎকার উদাহরণ। এই লেখায় আমরা VoiceOver নিয়ে কথা বলব, এর মূল ফিচারগুলো দেখাব এবং macOS ও Apple-এ VoiceOver-এর কিছু বিকল্প সাজেস্ট করব।
VoiceOver ইউটিলিটি কী?
VoiceOver হল Mac OS X অপারেটিং সিস্টেমের বিল্ট-ইন স্ক্রিন রিডার। এটি ম্যাকের অ্যাক্সেসিবিলিটি অপশনের মাত্র একটি অংশ। VoiceOver বেশিরভাগ Apple ও iOS পণ্যের (যেমন iPad, iPhone, Apple Watch, MacBook, iPod ইত্যাদি) সাথে ব্যবহার করা যায়। এটি Safari, ওয়েবপেজ, ওয়ার্ড প্রসেসর এবং আরও অনেক প্রোগ্রামের সাথে কাজ করে। আপনার স্ক্রিনে যা দেখা যায়, তা উচ্চস্বরে পড়ে শোনায়, তাই কম দৃষ্টিশক্তির ব্যবহারকারীরাও Apple ডিভাইস সহজে ব্যবহার করতে পারেন। VoiceOver রিফ্রেশেবল ব্রেইল ডিসপ্লেও সমর্থন করে। ব্রেইল ডিসপ্লে কম্পিউটারে সংযুক্ত করলে, এটি uncontracted বা contracted ব্রেইলে স্ক্রিনের তথ্য পাঠায়। এছাড়া, মাল্টি-টাচ ট্র্যাকপ্যাড দিয়েও বিভিন্ন VoiceOver জেশ্চার ব্যবহার করে পুরো ওয়েবপেজ, ডকুমেন্ট বা অ্যাপে নেভিগেট করা যায়। VoiceOver কার্সর দিয়ে দ্রুত যেকোনো অংশে ঘোরা যায়। বড় কালো চৌকো অংশটাই কার্সর, যেখানে ফোকাস থাকে। সহজ ইন্টারফেসও বড় সুবিধা। প্রথমবার চালু করলে সংক্ষিপ্ত টিউটোরিয়াল বা ইন্টারঅ্যাকটিভ ট্যুর দেখা যায়। এগুলো ছাড়াও ব্যবহার বেশ সহজ ও স্বচ্ছ। অনেকের ভালো লাগে কারণ কাস্টমাইজেশনের সুযোগ আছে—শর্টকাট ও জেশ্চার নিজের মতো করে সাজানো যায়। কীবোর্ড শর্টকাট তৈরিতে একটি modifier আর আরেকটি key ব্যবহার করুন। Siri-র মাধ্যমে ব্যবহার করতে চাইলে শুধু "Siri, turn VoiceOver on" বললেই হয়, অথবা Apple Menu-এর System Preferences থেকে চালু করা যায়। এখানেই Dictation ও বাকি অ্যাক্সেসিবিলিটি ফিচার পাওয়া যায়। নতুন ব্যবহারকারীদের জন্য কিছু কীবোর্ড কমান্ড:
- Option-Command-F5 – অ্যাক্সেসিবিলিটি শর্টকাট থেকে VoiceOver চালু/বন্ধ
- Command + টাচ আইডি তিনবার চাপুন – VoiceOver চালু করুন
- VO-F8 – VoiceOver Utility চালু
- VO-K – কীবোর্ড সহায়তা শুরু
- Tab-Arrow – নির্দিষ্ট দিকে স্ক্রিনে নেভিগেট
- VO-Space bar – চেকবক্স সিলেক্ট/আনসিলেক্ট
VoiceOver সক্রিয় হলে ব্যবহারকারীরা তাদের নোটিফিকেশন শুনতে পারবেন। স্ক্রিন কার্টেন ফিচারেও অ্যাপটি ভালো কাজ করে, তাই গোপনীয়তাও ঠিক থাকে।
VoiceOver-এর বিকল্পসমূহ
শিক্ষাগত সমস্যায় বা দৃষ্টিশক্তি কম থাকলে VoiceOver দারুণ স্ক্রিন রিডার। অনেক বিকল্প থাকায় তারা সহজে বিভিন্ন লেখা পড়তে পারেন। তবু অনেকেই এটি ব্যবহার করতে চান না। এখানে কিছু কাজে লাগা VoiceOver বিকল্প তুলে ধরা হলো।
Voice Dream Reader
Voice Dream Reader হল মোবাইল ও ট্যাবলেটের জন্য একটি পড়ার টুল। এতে টেক্সট-টু-স্পিচ ফিচার থাকায় লেখাকে কণ্ঠে রূপান্তর করে। এতে ডিসলেক্সিয়া-বান্ধব ফন্ট থাকায় ডিসলেক্সিয়া-আক্রান্তরা সহজে ব্যবহার করতে পারেন। এটি জনপ্রিয় কারণ, PDF, Microsoft Word, DAISY 3.0 (শুধু টেক্সট) ও DRM-মুক্ত EPUB সহ অনেক ফাইল টাইপ সাপোর্ট করে। ফাইল iTunes, Google Drive, Dropbox, অন্য অ্যাপ, ওয়ার্ড প্রসেসর ও আরও প্রোগ্রাম থেকে লোড করা যায়।
Text to Speech!
Text to Speech! যেকোনো টেক্সটকে শব্দে রূপান্তর করতে পারে। এতে ৯৫টি ভয়েস আছে। প্লেব্যাক স্পিড ও পিচ নিজের মতো ঠিক করা যায়। যে কেউ কোন লেখাকে ভাষায় বদলাতে চাইলে, অ্যাপের নির্ধারিত ঘরে পাঠ্য বসালেই হবে। পুরো প্রক্রিয়া খুব সহজ ও দ্রুত। ইন্টারনেট ছাড়াই অফলাইনে ব্যবহার করা যায়।
NaturalReader
NaturalReader আরেকটি টেক্সট-টু-স্পিচ টুল, যা ওয়েবপেজ, ইবুক, PDF, RTF, TXT ইত্যাদি ফরম্যাট থেকে পড়ে শোনায়। এখানে ব্যবহারকারীরা বক্তার গতি ও ব্যাকগ্রাউন্ড কালার পরিবর্তন করতে পারেন। সবচেয়ে ভালো দিক—এখানে স্বাভাবিক কণ্ঠের ভয়েস পাওয়া যায়, যা সাবলীল পড়া ও সঠিক উচ্চারণ শিখতে সাহায্য করে।
Capti Voice
Capti Voice অন্যতম জনপ্রিয় টেক্সট-টু-স্পিচ অ্যাপ। এটি দিয়ে বই, আর্টিকেল, ডকুমেন্ট, হোমওয়ার্ক ইত্যাদি শোনা যায়। Google Drive, OneDrive বা Dropbox সংযুক্ত করা যায়। রূপান্তরিত লেখাকে সংরক্ষণ, বুকমার্ক, হাইলাইট, কোন অংশ অনুবাদ করা ইত্যাদির সুবিধা আছে। পুরো অভিজ্ঞতা নিজের মতো কাস্টমাইজ করা যায়।
Speechify
Speechify আরেকটি টেক্সট-টু-স্পিচ টুল, যা VoiceOver-এর বিকল্প হতে পারে। এখানে প্রায় যেকোনো লেখাকে কণ্ঠে রূপান্তর করা যায়। Speechify-এর সুবিধা—এখানে স্বাভাবিক কণ্ঠের ভয়েস, পছন্দমতো ভাষা, ভয়েস, উচ্চারণ, স্পিড বাছাই ইত্যাদি করা যায়। ২০+ ভাষা এবং ৩০টি ভয়েস আছে, তাই সবাই নিজের মতো করে নিতে পারবেন। সবচেয়ে বড় সুবিধা—Speechify যেকোনো লিখিত টেক্সটকে কথায় রূপ দেয়—ডকুমেন্ট, সোশ্যাল মিডিয়া, ওয়েবপেজ ইত্যাদি থেকে। হার্ড কপি ডকুমেন্ট স্ক্যান করে খুব সহজেই তা ভাষায় পরিণত করা যায়।
VoiceOver বিকল্পের তুলনা
VoiceOver ছাড়া বিকল্প বাছার সময় তিনটি বিষয় দেখুন—ব্যবহার কতটা সহজ, কী কী সুবিধা আছে, এবং Apple ও macOS-এ ঠিকঠাক চলে কিনা। সেরা অপশন বাছতে এগুলো মাথায় রাখুন।
ব্যবহার কতটা সহজ?
VoiceOver জনপ্রিয় কারণ এতে সহজ জেশ্চার আছে। কিন্তু অন্যান্য বিকল্প আলাদা হতে পারে; ঠিক নতুন বাইক চালানোর মতো—যেটা চালিয়ে আরাম লাগে, সেটাই নিন। যেমন NVDA (NonVisual Desktop Access), বিনামূল্যে এবং মূলত Windows-এ চলে। এখানে জেশ্চারের বদলে কীবোর্ড শর্টকাট দিয়ে কাজ করা যায়, যেন গেমের শর্টকাট। বড় ইউজার কমিউনিটিও আছে সাহায্য করার জন্য। আর JAWS (Job Access With Speech)—এটি Windows-এর জন্য, নানা রকম ব্যবহার, শর্টকাট, স্পর্শ বা ব্রেইল ডিসপ্লে দিয়ে চালানো যায়। এক কথায়, পড়ার জন্য সবার হাতের কাছে মতো টুল আছে।
কী ফিচার আছে?
ভিন্ন প্রোগ্রামের আলাদা ফিচার থাকে। সুপারহিরো বাছার মতো, যেটা আপনার কাজে আসবে সেটাই বেছে নিন। NVDA বন্ধুসুলভ রোবটের মতো—অনেক অ্যাপ আর ওয়েবসাইট থেকে পড়ে শোনাতে পারে, যেমন ব্রাউজার, ইমেইল বা Word। JAWS ব্রেইলের জন্য স্পেশাল—আপনি ব্রেইল ব্যবহার করলে সেটার ধরন বদলাতে পারবেন, যেন সাইকেলের সিট আর হ্যান্ডেল নিজের মতো ঠিক করা।
Apple-এ ঠিকঠাক চলে কি?
আপনি যদি Apple ফ্যান হন, তাহলে এমন প্রোগ্রাম নিন যেটা Mac বা অন্য ডিভাইসে ভালো চলে। কিছুতে আলাদা সেটিংস দরকার, কিছু আবার একদম ঝামেলাহীন। VoiceOver Utility Apple-এর নিজস্ব, আগে থেকেই থাকে, তাই খুব মসৃণভাবে কাজ করবে। আপনি Apple ও Linux দুটোতেই চলা কিছু চাইলে Orca নিতে পারেন—দুই প্ল্যাটফর্মেই চলে, আর নিজের মতো কাস্টমাইজও করতে পারবেন। যেন একই জুতা দৌড় আর হাঁটা—দুটোতেই সমান আরামদায়ক।
Speechify – Apple ও Android-এর জন্য VoiceOver বিকল্প
Speechify সবচেয়ে ভালো VoiceOver বিকল্পগুলোর একটি। এটি Apple ও Android ডিভাইস, Windows ও Mac কম্পিউটারেও চলে। ব্রাউজার এক্সটেনশন হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। Speechify সহজ, কাস্টমাইজযোগ্য, এবং বহু প্ল্যাটফর্মে একই অভিজ্ঞতা দিতে তৈরি। অ্যাক্সেসিবিলিটি উন্নত করতে অনেক ফিচার আছে, ব্যবহারও সহজ। ফ্রি ও পেইড সাবস্ক্রিপশন প্ল্যান রয়েছে। যেকোনোটি ফ্রিতে ব্যবহার করে দেখুন এবং এর সুবিধা উপভোগ করুন।
FAQs
১. Apple ডিভাইসে কোন প্রেস কমান্ডে দ্রুত VoiceOver চালু করব?
Apple ডিভাইসে দ্রুত VoiceOver চালু করতে বিশেষ শর্টকাট ব্যবহার করুন। যেমন Option-Command-F5 একসাথে চাপলে VoiceOver চালু/বন্ধ হবে। Mac-এ Touch ID থাকলে, Command কী ধরে তিনবার Touch ID চাপলে VoiceOver চালু হয়। এই শর্টকাটগুলো দ্রুত ও সহজ ব্যবহার নিশ্চিত করে।
২. আমি কি VoiceOver বা অনুরূপ টুলে পডকাস্টে সহযোগিতা পাব?
হ্যাঁ, অবশ্যই পারবেন! VoiceOver ও Speechify-এর মতো টুল স্ক্রিনে থাকা বিভিন্ন লেখা পড়তে পারে। পডকাস্টের তথ্য বা ট্রান্সক্রিপ্ট থাকলে সেগুলোও পড়ে শোনাতে পারে। যদিও পডকাস্ট আগেই কথায় থাকে, লেখায় থাকা বাড়তি তথ্য বুঝতে এসব টুল কাজে দেবে। VoiceOver দিয়ে পডকাস্ট অ্যাপ চালানো ও এপিসোড বাছাই করাও আরও সহজ হয়।
৩. VoiceOver বা এর অন্য সংস্করণে জুম ফিচার আছে?
VoiceOver শুধু পড়ে শোনায়, তবে macOS-এ Zoom ফিচার দিয়ে স্ক্রিনের অংশ বড় করা যায়। VoiceOver-এর মতো কিছু টুল স্ক্রিন বড় করার অন্য অ্যাপের সাথেও ভালো কাজ করে। প্রতিটি টুলের সেটিংস একবার দেখে নিন—এভাবে চাইলে একসাথে শোনা আর বড় করে দেখা দুই-ই করতে পারবেন।

