কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত উন্নয়ন স্ক্যামারদের নতুন ফাঁদ পেতেছে। বর্তমানে বাড়ছে 'এআই ভয়েস ক্লোনিং স্ক্যাম', যেখানে প্রতারকেরা কারও কন্ঠ হুবহু নকল করতে AI ব্যবহার করে। এই লেখায় এই স্ক্যামগুলো কী, কীভাবে চলে, কী ঝুঁকি রয়েছে এবং আপনি ও আপনার আপনজনরা কীভাবে নিরাপদ থাকতে পারেন, তা সহজভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
স্বয়ংক্রিয় ফোন স্ক্যাম কীভাবে কাজ করে?
প্রতারকরা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে কন্ঠ ক্লোন করে। তারা সোশ্যাল মিডিয়া, ফোনকল, পডকাস্ট কিংবা ভয়েসমেইল থেকে ভয়েস স্যাম্পল জোগাড় করে। এরপর OpenAI-এর ChatGPT-এর মতো AI মডেলকে এগুলোর ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, যাতে নির্দিষ্ট ব্যক্তির কথা বলার ভঙ্গি শিখে নেয়। এই নকল কন্ঠ ব্যবহার করে শিকারকে বোঝানো হয় যে সে পরিবারের সদস্য, ট্রাম্পের মতো তারকা বা কোনো প্রতিষ্ঠানের কারও সঙ্গে কথা বলছে। স্ক্যামাররা কলার আইডিও স্পুফ করে, যেন নম্বরটি আসল মনে হয়।
ভয়েস এআই স্ক্যাম কী?
ভয়েস এআই স্ক্যাম মানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে কারও কন্ঠ নকল করে শিকারের কাছ থেকে সংবেদনশীল তথ্য বা পেমেন্ট হাতিয়ে নেওয়া, সাধারণত গিফট কার্ড বা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে। এই স্ক্যামগুলো ফোনকলের মাধ্যমে হতে পারে, আবার টিকটকের মতো সোশ্যাল মিডিয়ায় ভয়েস নোট পাঠিয়েও করা হয়।
ভয়েস এআই স্ক্যামের বিপদ কী?
এ ধরনের স্ক্যামে বড় অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে, পাশাপাশি সংবেদনশীল তথ্য ফাঁস হয়ে পরিচয় চুরির মতো অপরাধও ঘটতে পারে। কারণ, এরা আপনজন বা প্রতিষ্ঠানের কন্ঠে খুবই বিশ্বাসযোগ্যভাবে কথা বলে; ফলে মানসিক চাপ, ভয় আর অনেক সময় সম্পর্কের টানাপড়েন পর্যন্ত দেখা দেয়।
স্ক্যামার ও প্র্যাঙ্কস্টারের পার্থক্য কী?
স্ক্যামার ও প্র্যাঙ্কস্টার দুজনেই ফাঁদ পেতে প্রতারণা করতে পারে, তবে প্র্যাঙ্কস্টারের লক্ষ্য সাধারণত শুধু মজা করা বা চমকে দেওয়া, সরাসরি ক্ষতি করার উদ্দেশ্য থাকে না। স্ক্যামার ব্যক্তিগত লাভের জন্যই শিকারকে ঠকায় এবং গুরুতর আর্থিক ও মানসিক ক্ষতি ডেকে আনে।
ভয়েস এআই স্ক্যাম এড়াবেন কীভাবে?
এই স্ক্যাম থেকে বাঁচতে কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ:
- সচেতনতা: নিজের ও পরিবারের লোকদের এই স্ক্যাম সম্পর্কে খুলে বলুন। নতুন কৌশল জানতে টেক নিউজ আর আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নোটিশ নজরে রাখুন।
- সন্দেহপ্রবণতা: অপ্রত্যাশিত কল, হুট করে জরুরি টাকা বা কাজ চাইলে আগে সন্দেহ করুন, তারপর সিদ্ধান্ত নিন।
- যাচাই: কলারের পরিচয় নিজে যাচাই করুন, পরিচিত নম্বরে নিজে কল ব্যাক করে নিশ্চিত হন।
- কোডওয়ার্ড: পরিবারের জন্য আলাদা কোডওয়ার্ড ঠিক করুন, ফোনে পরিচয় মিলিয়ে নিতে সেটি ব্যবহার করুন।
- ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার বন্ধ: পরিচয় একেবারে নিশ্চিত না হলে ফোনে কখনো পাসওয়ার্ড বা পেমেন্ট তথ্য শেয়ার করবেন না।
- কল ব্লকিং: অপ্রয়োজনীয় কল আটকাতে কল ব্লকিং সার্ভিস বা অ্যাপ ব্যবহার করুন।
ফিশিং ফোনকল পেলে কী করবেন?
স্ক্যাম সন্দেহ হলে সঙ্গে সঙ্গে কল কেটে দিন, কোনো তথ্য দেবেন না। স্থানীয় পুলিশ ও ফেডারাল ট্রেড কমিশনে (FTC) রিপোর্ট করুন। কোনো নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্ম থেকে হয়ে থাকলে, সেখানেও রিপোর্ট জানিয়ে দিন।
Google Voice-এ স্ক্যামার রিপোর্ট করবেন কীভাবে?
Google Voice-এ স্ক্যামার রিপোর্ট করতে Google Voice ওয়েবসাইটে যান, স্ক্যাম কল বা মেসেজে ক্লিক করুন এবং 'Report Spam' অপশনটি বেছে নিন।
এআই কি কন্ঠ তৈরি করতে পারে?
হ্যাঁ, উন্নত এআই প্রযুক্তি কন্ঠ ক্লোন করতে পারে। এটি ঠিকমতো করতে অনেক ভয়েস ডেটা লাগে। তবে OpenAI-এর ChatGPT এর মতো প্রযুক্তি নিজে থেকে কোনো ক্ষতিকর নয়, স্ক্যামাররাই এগুলোকে ভুল হাতে ব্যবহার করে।
স্ক্যাম থেকে রক্ষা পাওয়ার সেরা ৮টি সফটওয়্যার/অ্যাপ:
- Truecaller (iOS/Android): স্প্যাম কল সহজে শনাক্ত ও আটকে দেয়।
- Hiya (iOS/Android): কলার আইডি দেখায় এবং অনাকাঙ্ক্ষিত কল ব্লক করে।
- RoboKiller (iOS/Android): ১.১ মিলিয়নেরও বেশি রোবোকল ও টেলিমার্কেটার নম্বর ব্লক করে।
- Nomorobo (iOS/Android): বিরক্তিকর রোবোকল, টেলিমার্কেটার আর স্ক্যাম কল থামিয়ে রাখে।
- Call Control (iOS/Android): পার্সোনাল কল ব্লকার, কমিউনিটি-আপডেটেড ব্লকলিস্ট ব্যবহার করে।
- Avast Antivirus (iOS/Android): সাইবারসিকিউরিটি ও ফিশিং স্ক্যাম থেকে সার্বিক সুরক্ষা দেয়।
- McAfee Mobile Security (iOS/Android): পূর্ণাঙ্গ মোবাইল সুরক্ষা, ক্ষতিকর ওয়েবসাইটে ঢোকা রোধ করে।
- Norton Mobile Security (iOS/Android): ঝুঁকিপূর্ণ অ্যাপ, স্ক্যাম কল ও অন্যান্য অনলাইন হুমকি থেকে সুরক্ষা দেয়।
মনে রাখুন, স্ক্যামাররা নিউ ইয়র্ক থেকে অ্যারিজোনা, ফ্লোরিডা থেকে ওয়াশিংটন ডিসি—সবখানেই মানুষকে টার্গেট করে। সবসময় বিশ্বস্ত সূত্র থেকে হালনাগাদ খবর আর সেরা সফটওয়্যারের রিভিউ দেখে নিন। একসঙ্গে সচেতন থাকলে আমরা ফ্রড কমিয়ে আরও নিরাপদ ডিজিটাল দুনিয়া গড়ে তুলতে পারি।

